মাছ চাষ করে ভাগ্য বদলে গেছে তাদের

মাছ চাষ করে ভাগ্য বদলে গেছে তাদের

ময়মনসিংহে অনেক বেকার ও অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে শুধু মাছ চাষকে কেন্দ্র করে। তারা সবাই এখন সচ্ছল জীবনযাপন করছেন। তাদের দেখে প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তারাও হয়েছেন সফল।

তেমনি একটি এলাকা ময়মনসিংহের আলালপুর। এ এলাকার বহু মানুষ এখন মাছ চাষের সাথে জড়িত। কথা হয় ওই এলাকার পুরোনো মাছচাষি মো. মনিরুজ্জামান জুয়েলের সাথে। তিনি প্রথমে ছোট আকারের পুকুরে মাছ চাষ করলেও এখন চার একর জায়গায় চারটা ফিশারি তার। আরও একটি ফিশারি বাড়ানোর কাজ চলমান।

তিনি বলেন, মাছ চাষ করে এখন আমি লাভবান। প্রথমে যখন মাছ চাষে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা ভাবছিলাম তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হই, তাহলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব কিনা সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু ভয়কে দূর করে ছোট আকারে একটি পুকুর খনন করে বাংলা মাছের চাষ করা শুরু করি। প্রথম বছরই আশার আলো দেখি। দিন দিন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে লাভবান হতে থাকি। তখন ফিশারির সংখ্যা বৃদ্ধি করার সাথে সাথে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করি। বর্তমানে আমি মাছ চাষ করে সফল।

তাদের মতো সফলদের অনুকরণ করে এলাকার অনেকে একই ব্যবসা শুরু করেন। তেমনি একজন আতিকুর রহমান।

Maymansing-(5).jpg

তিনি প্রথমে ধানের ব্যবসা দিয়ে আর্থিক সচ্ছলতার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় লাভের মুখ দেখতে পারেননি। কিন্তু তিনি দেখেন তার চোখের সামনেই অনেকে মাছ চাষ করে সফলতা অর্জন করেন। তখনই এলাকার সফল মাছ চাষিদের সাথে পরামর্শ করে মাছ চাষের সাথে সম্পৃক্ত হন।

তিনি বলেন, শুরুটা ছোট পরিসরে হলেও এখন তা বৃদ্ধি করে ৬ একর জায়গার ওপর হ্যাচারি একটি আর ১২টি ফিশারি করেছি। লাভ না হলে এতগুলো ফিশারি করা সম্ভব ছিল না। তিনি জানান, বছরে তার ৭-৮ লাখ টাকা আয় হয় মাছ চাষ থেকেই।

একেবারেই নতুন মাছচাষি মুসলেম উদ্দীন। বয়স ৬৫ বছর। শুধু কৃষিকাজ করে তার সংসার চলছিল। তিনি চিন্তা করেন কিছু একটা করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তার মনে প্রচণ্ড সাহস ছিল।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকার খায়রুজ্জামানকে দেখে উৎসাহ পেয়েছি। সফল মাছচাষি খায়রুজ্জামান এ এলাকার নতুন মাছি চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণার পাত্র।

মুসলেম উদ্দিন সফল এ মাছ চাষির কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে চাষ শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার এখন আর চিন্তা নেই। কৃষিকাজ করি। ৭০ শতাংশ জমির ওপর মাছ চাষ করি। এতটুকু জায়গার মাছ বিক্রি করেই ভালো লাভবান হয়েছি। সামনের বছর আরও বড় আকারে মাছ চাষ করবো।

Maymansing-(5).jpg

মাছ চাষের ফিশারি আর হ্যাচারিতে কাজের সাথে সম্পৃক্ত করেকজন শ্রমিক জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করি। কেউ ৯ হাজার টাকা আবার কেউ ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। এ টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চালাই।

ময়মনসিংহের সফল মাছচাষি আলালপুর হ্যাচারি অ্যান্ড ফিশারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান। তার বাবা হাজি ওমর আলী ছিলেন একজন সফল মাছচাষি। মোখলেছুর রহমান পড়াশোনা শেষ করে বিভিন্ন ফার্মাসিউক্যালসে চাকরি করতেন। হঠাৎ তার বাবা মারা যান। তিনি জানতেন তার বাবা মাছ চাষে সফলতা অর্জন করেছেন। তিনি চাকরি ছেড়ে ২০১০ সালে মাছ চাষে মনোনিবেশ করেন। হয়েছেন বাবার মতোই সফল।

বর্তমানে ২৫-২৭ একর জায়গায় তাদের ৪০-৪৫ টারও বেশি ফিশারি রয়েছে। পাশাপাশি হ্যাচারি দুটি। পরিবারের সবাই মিলে ফিশারি দেখাশোনা করেন। তার এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ২০-২২ জন শ্রমিক।

মোখলেছুর রহমান জানান, মাছ চাষের সময়টা ভালোই যাচ্ছিল। হঠাৎ করে করোনার মহামারি মাছ চাষে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। একদিকে কিছু মাছের খাদ্যের দাম বিভিন্ন কোম্পানি বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে লকডাউনের সময় মাছ ঠিকমতো পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমার ফিশারির মাছ আর হ্যাচারির পোনা যায়। গাড়ি মাছ নিয়ে যেতে পারলেও ফিরে আসার সময় মাছের খালি গাড়িতে পুলিশের চেকপোস্টসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

Maymansing-(5).jpg

তিনি বলেন, করোনাকালের সময়টা মাছচাষিদের ভালো যাচ্ছে না। তবে এমন সময় বেশি দিন থাকবে না। মাছ চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা উল্লেখ করে বলেন, আমি শিং, মাগুর, টেংরা, গুলসা, সিলবার, রুই, কাতলা, মৃগেল, কালীবাউশ, কই, তেলাপিয়া ও সরপুঁটিসহ সব ধরনের বাংলা মাছ চাষ করে লাভবান হয়েছি। আগ্রহী নতুন এবং শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাছ চাষে যোগ দিতেও গুরুত্ব দেন তিনি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সাহা জাগো নিউজকে জানান, বিভাগে ৬ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। উৎপাদিত মাছের সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন জেলার বাইরে পাঠানো হয়। বিভাগে ২ লাখ ৯ হাজার ৪৩৩ জন মাছের খামারি আছে। এর মধ্যে ৩২৩ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত হ্যাচারি রয়েছে এবং প্রায় সাড়ে ১৬শ এর মতো নার্সারি রয়েছে।

তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিলে লকডাউন থাকার কারণে মাছ চাষিদের ওপর প্রভাব পড়েছে। এজন্য সরকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা ৪ শতাংশ সুদে প্রণোদনা দেবে। ইতোমধ্যে ২৪টা ব্যাংকের সাথে সরকারের চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি পেয়েছি। তবে আলোচনার পরই বলা যাবে ময়মনসিংহ জেলায় মাছের খামারিদের জন্য কত টাকা প্রণোদনা আসবে। এ প্রণোদনার ক্ষেত্রে মাছ চাষিদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে প্রণোদনা দেয়া হবে। বিশেষ করে হ্যাচারি, নার্সারি ও খামারিদের তালিকা তৈরি করা হবে।

তিনি বলেন, আমরা সবসময় মাছ চাষিদের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছি। যদি কেউ মাছ চাষ শুরু করতে চায় তবে আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেব।

প্রসঙ্গত, দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এখন মাছ চাষ এবং এ সম্পর্কিত ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য সম্পদের অবদান এখন ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশ মাছ আসছে পুকুর থেকে। পুকুরে মাছ চাষের কারণে গত তিন দশকে মোট উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। মাছ চাষ ও ব্যবসায় দুই কোটির কাছাকাছি মানুষ যুক্ত আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *